প্রতি বছর কোরবানির ঈদে একই চিত্র ফুটে ওঠে— কাঁচাচামড়ার বাজারে সেই পুরোনো হাহাকার। উপযুক্ত মূল্য ও সক্ষম ক্রেতার অভাবে জেলায় জেলায় এবং রাজধানীর সড়কের পাশে পচে নষ্ট হয় স্তূপ করে রাখা হাজার হাজার পিস কাঁচাচামড়া। কোথাও লোকসান গুনে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে হয়েছে, কোথাও আবার রাগে-ক্ষোভে চামড়া রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়েছে কিংবা গর্ত খুঁড়ে মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। সাভার চামড়া শিল্পনগরীর পিচঢালা পথ ও আশপাশের পরিবেশেও চামড়া ও বিষাক্ত বর্জ্যের অব্যবস্থাপনার কালচে দাগ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে।
যে চামড়াকে একসময় বাংলাদেশের ‘দ্বিতীয় সোনালি আঁশ’ বা ‘সোনার চামড়া’ বলা হতো, তা আজ বছরের পর বছর ধরে চলা নীতিগত পক্ষাঘাত ও স্থায়ী অব্যবস্থাপনার কারণে ডাস্টবিনের আবর্জনার মতো অবহেলিত। বিপুল কাঁচামাল, দীর্ঘদিনের ট্যানিং অভিজ্ঞতা এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী শ্রমশক্তির কারণে চামড়া খাতকে পোশাকশিল্পের পর রপ্তানি বহুমুখীকরণের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো। অথচ বিশ্ববাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা যখন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, বাংলাদেশ তখন মূলত কম মূল্যসংযোজনের কাঁচামাল ও আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানির বৃত্তেই আটকে আছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, বিপুল কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও কেন এই খাত সামনে এগোতে পারছে না? কেন প্রতি বছর কোরবানির মৌসুমে দেশের হাজার কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ নর্দমায় ভেসে যায়? চামড়াশিল্পের এই সংকট কি কেবল পরিবেশগত, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষাঘাত?
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভিয়েতনামের চামড়া ও পাদুকা খাতের রপ্তানি আয়ের ব্যবধান ছিল একেবারে সামান্য। কিন্তু গত তিন দশকে দুই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে গিয়ে পৌঁছেছে। ভিয়েতনাম আজ কেবল জুতো রপ্তানি করেই বছরে প্রায় ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে, যা বাংলাদেশের চামড়া খাতের মোট রপ্তানি আয়ের চেয়ে প্রায় ২৫ গুণ বেশি! ভিয়েতনামের নিজস্ব কোনো উল্লেখযোগ্য কাঁচামালের উৎস নেই; তারা বিশ্ববাজার থেকে বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কাঁচাচামড়া আমদানি করে তা উন্নত প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাত ও উচ্চমূল্যের চামড়াজাত পণ্যে রূপান্তর করে বৈশ্বিক বাজার দখল করেছে।বিপরীতে, বিশ্বমানের নিজস্ব কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এক বিলিয়ন ডলারের এক অদৃশ্য খাঁচায় বন্দি হয়ে আছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করলে এক হতাশাজনক স্থবিরতার চিত্র ফুটে ওঠে। গত পাঁচ অর্থবছরে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের ওঠা-নামা বা অস্থিতিশীলতা দেখা গেছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন